রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম

ভুল ওষুধের পরামর্শে পুড়ল কৃষকের স্বপ্ন, টমেটো ক্ষেত নষ্ট- হাসপাতালে কৃষক


  মো: মহিউদ্দিন আহাম্মেদ

প্রকাশ :  ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৮ দুপুর

কয়েক সপ্তাহ পরই টমেটো বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধের স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রান্তিক কৃষক গিরিধন সরকার। আগাম জাতের টমেটো চাষে বিনিয়োগ করেছিলেন এনজিও ও বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে। গাছে ফুল আসতে শুরু করেছিল। প্রতিদিন তাঁর জমিতে কাজ করতেন ২০ থেকে ৩০ জন শ্রমিক। কিন্তু কীটনাশকের পরিবর্তে আগাছানাশক প্রয়োগের পর নষ্ট হয়ে গেছে ২৫০ শতক জমির টমেটো ক্ষেত। প্রায় ১৬ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই কৃষক।

ঘটনাটি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার আন্দিউড়া ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামের। পরিবারের অভিযোগ, কীটনাশক কোম্পানির প্রতিনিধির পরামর্শে ওষুধ কিনে জমিতে প্রয়োগ করার পরই টমেটো গাছগুলো সাদা হয়ে যায়। ধীরে ধীরে পুরো ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক গাছের গোড়ায় পচন ধরেছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ৭ অক্টোবর টমেটো গাছে পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিলে ওষুধ কিনতে মাধবপুর বাজারের বিসমিল্লাহ বীজ ভান্ডারে যান গিরিধন সরকার। সেখানে অটোকেমিক্যাল কোম্পানির প্রতিনিধি মো. মনিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে ওষুধ কেনেন তিনি। পরে সেই ওষুধ জমিতে স্প্রে করেন। এরপরই টমেটো গাছের এমন ক্ষতি হয় বলে দাবি পরিবারের।

আগাম টমেটো চাষ করে ভালো দামে ফসল বিক্রির আশা ছিল গিরিধনের। কিন্তু চোখের সামনে ক্ষেত নষ্ট হতে দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। পরিবারের দাবি, ফসলের ক্ষতির দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে বর্তমানে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন গিরিধন।

ফসল নষ্ট হওয়ায় এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি ও তাঁর পরিবার। যে ফসল বিক্রি করে সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর কথা ছিল, সেই ফসলই এখন তাঁদের অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ঘটনায় ক্ষতিপূরণ ও আইনগত ব্যবস্থা চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন গিরিধনের ভাই সুলতানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রায়ধন সরকার।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে কীভাবে সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে সহযোগিতা করা যায়, সেটিও দেখা হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজিব সরকার জানান, বৃহস্পতিবার সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষক কীটনাশকের পরিবর্তে আগাছানাশক প্রয়োগ করায় টমেটো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকও ওষুধের বোতল যাচাই না করেই প্রয়োগ করার কথা স্বীকার করেছেন। বিষয়টি আরও যাচাই করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে বিক্রেতাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জমিতে ওষুধ প্রয়োগের আগে লেবেল ভালোভাবে পড়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে। কৃষকদের কৃষিবিষয়ক পরামর্শ দিতে কৃষি বিভাগ সব সময় প্রস্তুত রয়েছে।

এখন গিরিধন সরকারের পরিবারের সামনে একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ। ফসল হারিয়ে অসুস্থ কৃষক হাসপাতালে, আর জমিতে পড়ে আছে নষ্ট হয়ে যাওয়া টমেটো গাছ। পরিবারটির প্রত্যাশা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে, যাতে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান এই প্রান্তিক কৃষক।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত