রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩
শিরোনাম

ভারী বর্ষনে কেন্দুয়ায় তলিয়ে গেছে ৩ হাজার হেক্টর পাকা বোরো জমি 


  সমরেন্দ্র বিশ্বশর্মা, কেন্দুয়া প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ০৩ মে ২০২৬, ১০:২১ দুপুর

কৃষকের দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল তাদের স্বপ্নের পাকা বোরো ধানের ফসল মাঠ থেকে কেটে এনে গোলায় তোলবেন। সারাবছর খাবেন কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নে গুড়েবালি। গত কয়েক দিনের একটানা ভারী বর্ষনে এক থেকে দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর পাকা বোরো জমির ধান। এতে হাজার-হাজার কৃষক পরিবারের মাথায় হাত পরেছে। 
কৃষক, কৃষক প্রতিনিধি ও জনপ্রতিনিধিগণ অভিযোগ করে বলেন, কয়েকদিনের ভারী বর্ষনে কেন্দুয়া উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়নে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর পাকা বোরো জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কিন্তু উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ প্রথমে ৩৭৫ হেক্টর এবং ১দিন পরে ৮৬০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে বলে মনগড়া রিপোর্ট তৈরী করে সরকারের নিকট পাঠিয়েছেন। 

কৃষি বিভাগের এ রিপোর্ট নিয়ে চরম অসস্তোষ প্রকাশ করেছেন ১৫৯ নেত্রকোণা ৩ আসনের এমপি ও নেত্রকোণা জেলা বিএনপির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী। শুক্রবার ১লা মে বেলা আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি উপজেলার কান্দিউড়া, নওপাড়া ও বলাইশিমুল ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা ঘুরে-ঘুরে দেখেন। এসময় তাঁকে কাছে পেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা কান্নায় ভেঙ্গে পরেন। সন্ধ্যার পর বলাইশিমুল ইউনিয়নের সাইডুলি নদীর তীরে গোপালপুর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় সরকার ও গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, কয়েক দিনের ভারী বর্ষনে কেন্দুয়া উপজেলার প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার হেক্টর বোরো জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ ক্ষতি গ্রস্থ এলাকায় না গিয়ে কৃষকদের সাথে কথা না বলে প্রথমে ক্ষয় ক্ষতি ৩৭৫ হেক্টর একদিন পরে তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে গত বৃহস্পতিবার ৮৬০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে বলে সরকারের নিকট রিপোর্ট পাঠিয়েছেন।

এমপি রফিকুল ইসলাম হিলালী সংশ্লিষ্টদের মাঠে গিয়ে কৃষকদের সাথে কথা বলে খুব দ্রুত সঠিক রির্পোট সরকারের নিকট পাঠানোর অনুরোধ জানান। এসময় তিনি বলেন সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তিন মাসের জন্য খাদ্য সহায়তা দেবেন। কিন্তু যদি ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক বেশি হয় এবং রিপোর্টে কম থাকে তাহলে তাদেরকে এই খাদ্য সহায়তা কে দেবে? ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সঠিক তালিকা না হলে কৃষকরা কৃষি বিভাগের মনগড়া রিপোর্ট নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করতে বাধ্য হবে। 


মোজাফরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান ভূইয়া মজনু অভিযোগ করে বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ মাঠে না গিয়ে অফিসে বসেই দায়সারা গোছের তথ্য পাঠিয়েছেন। যা ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সাথে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই না। তিনি বলেন শুধু মাত্র জালিয়ার হাওড় ও সুনই হাওড়েই কয়েক হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। অথচ তারা সমস্ত উপজেলায় ৮৬০ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে বলে ভুল রিপোর্ট দিয়েছেন। আমরা এর সুষ্ট তদন্ত ও বিচার চাই। 
বলাইশিমুল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর তালুকদার মল্লিক জানান তার ইউনিয়নের কৃষকরা বগাজান, বেখুয়া, কিচুরিয়া ও মোয়াটিয়া বিলে যেসব বোরো জমিতে ধান চাষ করেছিলেন, সেখানে সব জমির কাচা-পাকা ধান তলিয়ে গেছে। এতে কুমুড়–রা, জুড়াইল, সরাপাড়া ও কামাওগাঁও গ্রামের শত শত কৃষক পরিবার এক মুষ্টি ধানও ঘরে তুলতে পারেন নি।

রোয়াইবাড়ি আমতলা ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের কৃষক মুজিবুর রহমান জানান মাচুআইল ও কাকিনা বিলে সবপাকা জমি এক থেকে দুই ফুট পানির নিচে তালিয়ে গেছে। তিনি জানান রঙ্গিকালি খাল খননের অভাবে ভরাট হয়ে গেছে, ভারী বর্ষনের ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে সব ফসল তলিয়ে গেছে। এছাড়া পাইকুড়া, চিরাং, মাসকা, সান্দিকোনা, গড়াডোবা, গন্ডা, দলপা ও আশুজিয়া ইউনিয়নে হাওড় ও বিলের জমি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তলিয়ে গছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উজ্জল সাহার সাথে যোগাযোগ করা হলে শনিবার তিনি জানান, উপজেলায় ২০ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে বোরো আবার করা হয়েছিল। এর মধ্যে হাওড়ে ১ হাজার ৩০ হেক্টর জমি। তার দাবি এই জমির মধ্যে ৫৬০ হেক্টর পাকা জমি কৃষকরা কর্তন করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য মতে হাওড়ের জমি ক্ষতি হয়ে ৩৭৫ হেক্টর এবং নন হাওড়ে ৪৮৫ হেক্টর মিলে ৮৬০ হেক্টর। উপজেলার ৪০টি ব্লকে কর্মরত ৩৭ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার দেওয়া রিপোর্টে প্রথমে ৩৭৫ হেক্টর এবং একদিন পর বৃহস্পতিবার সংশোধন করে ৮৬০ হেক্টর জমি তলিয়ে যাওয়া রিপোর্ট পাঠিয়েছে। তিনি বলেন ১ হেক্টর জমিতে বর্তমান বাজার ধরে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ক্ষতি হবে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এ হিসাবে ৮৬০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হবে ১১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। কৃষি কর্মকর্তা বলেন ৩ হাজার হেক্টর জমির ক্ষতি হয়েছে তা বলতে পারছি না, তবে এখনো বৃষ্টি হচ্ছে আমরা আরো রিপোর্ট সংগ্রহ করে আগামী সোমবার চূড়ান্ত রিপোর্ট মন্ত্রনালয়ে পাঠাবো, সেখানে ক্ষতির পরিমান আরো বাড়তে পারে। বেসরকারি হিসাব মোতাবেক ১ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতির পরিমান ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার হিসাবে ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হবে ৩৯ কোটি টাকা।

সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূইয়া মজনু বলেন ২৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ক্ষতি কম দেখানো হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে ক্ষতি গ্রস্থ কৃষকদের ৩ মাসের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলে এই টাকা কে দেবে? তিনি এর সুষ্ট তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত