চরাঞ্চল মানুষের জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যসেবা
আসাদুজ্জামান রুবেল
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫১ দুপুর

এ যেন এক জলন্ত প্রতিচ্ছবি-ছোট বাচ্চাকে কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে স্বজনরা। ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষের জীবন এখনো রয়ে গেছে অনুন্নয়নের অন্ধকারে। আধুনিকতার ছোঁয়া এখানে যেন পৌঁছায়নি। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা-সব ক্ষেত্রেই প্রতিদিন লড়াই করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
বর্ষা এলেই চারপাশের জনপদ নদীর পানিতে তলিয়ে গিয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। নৌকা ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় থাকে না। অনেক সময় মাঝরাতে রোগী অসুস্থ হলে নৌকা জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, শুকনো মৌসুমে সেই নদীই পরিণত হয় ধুধু বালুচরে। কয়েক কিলোমিটার বালুর ওপর দিয়ে হেঁটে রোগী বহন করা যেন এক নির্মম বাস্তবতা।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে। জরুরি মুহূর্তে হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো দ্রুত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারীকে খাটিয়া বা বাঁশের “চলচকি”তে করে বহন করা হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক সময় রাস্তাতেই প্রসব বেদনা শুরু হয়। কেউ কেউ পথেই সন্তান প্রসব করেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে জটিলতার কারণে গর্ভপাত বা মায়ের জীবনহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
শুধু গর্ভবতী নারীই নয়, সাধারণ রোগীরাও একই দুর্ভোগে পড়েন। সাপের কামড়, জ্বর, দুর্ঘটনা বা হঠাৎ অসুস্থতা-যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় বাড়ছে ঝুঁকি। অনেকে অর্থাভাবে দূরের হাসপাতালে যেতে পারেন না, আবার অনেক সময় পথের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে মাঝপথেই ফিরে আসতে বাধ্য হন।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা যেন এই দেশের নাগরিক হয়েও আলাদা এক পৃথিবীতে বাস করি। অসুখ হলে ভাগ্যের উপরই ভরসা করতে হয়।”
এদিকে অনেক চর এলাকায় এখনো নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স বা কার্যকর কমিউনিটি ক্লিনিক। যেগুলো আছে, সেগুলোতেও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। বিদ্যুৎ, পরিষ্কার পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় অপ্রতুল, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চরাঞ্চলের এই দীর্ঘদিনের অবহেলা দূর করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত ধাত্রী, মোবাইল মেডিকেল টিম, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স এবং টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
তাই এলাকাবাসীর বিশেষ দাবি, চর অঞ্চলের মানুষগুলো যেন আর এমন হতদরিদ্র ও অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে না পড়ে।







