পূর্বধলায় ফিশারি ও কৃষিজমিতে চাষাবাদে বাধা-হুমকির অভিযোগ, ভাই-ভাতিজাদের বিরুদ্ধে
নাহিদ আলম, স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৮ দুপুর

নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার জারিয়া ইউনিয়নের গোজাখালীকান্দা গ্রামে পৈতৃক ও খরিদকৃত জমিতে ধান ও মাছ চাষে বাধা, মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে সহোদর ভাই ও ভাতিজাদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মো. হারুন অর রশিদ খান পাঠান (৫৯) জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পূর্বধলা থানায় লিখিত অভিযোগ এবং সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
চলতি আমন মৌসুমে জমিতে চাষাবাদ করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক মো. হারুন অর রশিদ খান পাঠান।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গোজাখালীকান্দা গ্রামের মৃত আব্দুল গফুর খান পাঠানের ছেলে মো. হারুন অর রশিদ খান পাঠানের সঙ্গে তাঁর সহোদর ভাই মো. আবুল কাশেম খান পাঠান (৬০) এবং ভাতিজা মো. বাবু খান পাঠান (২৭) ও মো. রুম্মান খানের দীর্ঘদিন ধরে জমি-জমা নিয়ে বিরোধ চলে আসছে।
হারুন অর রশিদ খান পাঠানের দাবি, ওয়ারিশসূত্রে এবং বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে তিনি মোট ৩ একর ২৯ দশমিক ৮১ শতাংশ জমি ভোগদখল করে আসছেন। তবে প্রতিপক্ষের লোকজন ওই জমি বেদখলের চেষ্টা করছেন। গত ৩০ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে নিজ দখলীয় জমিতে হালচাষ করতে গেলে তাঁকে বাধা দেওয়া হয় এবং মারধর ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরে স্থানীয়ভাবে দরবার ও সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হলেও প্রতিপক্ষ সালিশের সিদ্ধান্ত না মেনে জমিতে ধান রোপণ এবং পুকুরে মাছ চাষে বাধা দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ তাঁর। এ ঘটনায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর পূর্বধলা থানায় জিডি (নং-৭৯৩) করেন তিনি। এছাড়া গত ২৩ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগকারী মো. হারুন অর রশিদ খান পাঠান বলেন, “আমি বৈধভাবে কেনা ও পৈতৃক জমি দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছি। কিন্তু আমার ভাই আবুল কাশেম ও তাঁর ছেলেরা আমাকে জমিতে ধান চাষ এবং পুকুরে মাছ চাষ করতে দিচ্ছে না। তারা আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। জমিতে কাজ করতে গেলে শ্রমিকদেরও মারধর ও হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। আগেও একজন শ্রমিককে জমিতে কাজ করতে গেলে মারধর করে পা ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আমি একজন কৃষক এবং শারীরিকভাবেও অসুস্থ। এই জমি ও ফিশারিই আমার উপার্জনের প্রধান সম্বল। চাষাবাদ করতে না পারলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।”
এ বিষয়ে তিনি আরও জানান, তার মৃত বড় ভাই মোস্তাফিজুর রহমান রনুর জমিতেও চাষাবাদে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। সব মিলিয়ে দুইজনের প্রায় ১২ একরের বেশি জমি ও ফিশারি অনাবাদি রয়েছে। স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করেও সমাধান না হওয়ায় বাধ্য হয়ে প্রশাসন ও পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জমি নিয়ে বিরোধের কারণে আমন মৌসুমে ৮০ কাঠার বেশি কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে আছে। একইভাবে ৮০ কাঠার বেশি ফিশারিতে মাছ চাষও ব্যাহত হচ্ছে। এতে ধান ও মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এসব জমিতে ধান ও ফিশারিতে মাছ চাষ করা সম্ভব হলে খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কৃষকদের আর্থিক লাভও হতো। কিন্তু চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় তাঁরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। দ্রুত বিরোধের সমাধান করে জমি ও ফিশারিতে স্বাভাবিকভাবে চাষাবাদের সুযোগ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিবাদী মো. আবুল কাশেম খান পাঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাদের পূর্বে যৌথভাবে কেনা জমি এখনো সঠিকভাবে বণ্টন হয়নি। পাশাপাশি ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমির একটি অংশ থেকেও তাঁকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আবুল কাশেম খান পাঠানের অভিযোগ, স্থানীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে জমি নিয়ে তার পূর্ববিরোধ রয়েছে। এ কারণে একটি সালিশে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর চাষের জমি মো. হারুন অর রশিদ খান পাঠানের নামে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমার প্রাপ্য জমি এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। জমি সঠিকভাবে বণ্টন না হওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে চাষাবাদ করতে দেওয়া হবে না।”
এদিকে, আবুল কাশেমের তোলা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করে জারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল মন্ডল নান্টু বলেন, স্থানীয়ভাবে বসে আমরা বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আবুল কাশেম সাহেব শালিসের সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। আমার বিরুদ্ধে তিনি যে অভিযোগ করছেন তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। যেহেতু বিষয়টি এখন প্রশাসন ও থানা পর্যন্ত গড়িয়েছে, তাই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এর একটি সুষ্ঠু সমাধান হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে পূর্বধলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, "এ ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও লিখিত অভিযোগ জমা হয়েছে। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম বলেন, "জমি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।"







