বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩
শিরোনাম

ইতিকাফ যেভাবে পালন করবেন


  আরবান ডেস্ক

প্রকাশ :  ২২ মার্চ ২০২৫, ১১:২৫ দুপুর

পবিত্র রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে ইতিকাফ করা জরুরি আমল। এ সময় সারা দেশে সুন্নত ইতিকাফে বসেন মুসল্লিরা। ইতিকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো অবস্থান করা, স্থির থাকা। পরিভাষায় ইতিকাফ বলা হয়Ñদুনিয়াবি কাজকর্ম এবং পরিবার-পরিজন থেকে পৃথক হয়ে সওয়াবের নিয়তে মসজিদে কিংবা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা।

ইতিকাফের ফজিলত : হাদিসে ইতিকাফের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সওয়াবের উদ্দেশ্যে রমজান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফ করবে তার নামে দুটি কবুল হজ এবং ওমরাহর সওয়াব লেখা হবে’ (বায়হাকি)। 

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি খালেস নিয়তে ইতিকাফ করবে তার পূর্ববর্তী সব সগিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে’ (দায়লামি)। হুজুর (সা.) নিজেও সর্বদা ইতিকাফ করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামদেরও ইতিকাফের প্রতি উৎসাহিত করতেন। ইতিকাফকারীদের জন্য রয়েছে বহু সওয়াবের সুসংবাদ।

ইতিকাফের প্রকারভেদ : ইতিকাফ তিন প্রকার এক. ওয়াজিব। দুই. সুন্নতে কিফায়া। তিন. নফল। মানতের ইতিকাফ আদায় করা ওয়াজিব। যদি কোনো ব্যক্তি মানত করে আমার অমুক কাজটি সম্পাদন হলে আমি ইতিকাফ করব তা হলে সে কাজ সম্পাদন হলে ওই ব্যক্তির জন্য ইতিকাফ করা ওয়াজিব। ইতিকাফ না করলে গুনাহগার হবে। আর রমজান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নতে কিফায়া। এ ছাড়া বছরের  যেকোনো দিন যেকোনো সময়ে নফল ইতিকাফ করা যাবে। (বেহেশতি জেওর : ২৭০)

ইতিকাফ পালনের সময়সীমা : নফল ইতিকাফ সামান্য সময়ের জন্যও হতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তি এক মিনিট কিংবা অর্ধ মিনিটের জন্য ইতিকাফের নিয়ত করে মসজিদে অবস্থান করে, তা হলে তা ইতিকাফ বলে গণ্য হবে। সুন্নতে কিফায়া ইতিকাফের সময় হলোÑরমজানের বিশ তারিখে সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত। ওয়াজিব ইতিকাফের ন্যূনতম সময় হলো এক দিন। এক দিনের কম সময়ের জন্য ইতিকাফের মানত করা সহিহ নয়। এক দিনের বেশি যতদিন ইচ্ছে ততদিন ইতিকাফের মানত করা যাবে। তবে যেসব দিনে রোজা রাখা হারাম ওইসব দিনে ইতিকাফের মানত করা জায়েজ নেই। কারণ মানতের ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা আবশ্যক। রোজা রাখা ব্যতীত মানতের ইতিকাফ আদায় হবে না। (বেহেশতি জেওর : ২৭০)

ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা : নফল ইতিকাফের যেহেতু কোনো সময়সীমা নেই তাই নফল ইতিকাফ আদায়ের জন্য রোজা রাখা শর্ত নয়। সুন্নতে কিফায়া ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা আবশ্যক। সুতরাং যদি কোনো ব্যক্তি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করে কিন্তু সফর অথবা অসুস্থতার কারণে রোজা না রাখে তা হলে তার ইতিকাফ আদায় হবে না। ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা আবশ্যক। যদি কোনো ব্যক্তি ইতিকাফের মানত করে এবং রোজা না রাখার শর্ত করে তবু তার রোজা রাখতে হবে। রোজা না রাখলে মানতের ইতিকাফ আদায় হবে না। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘রোজাবিহীন ইতিকাফ গ্রহণযোগ্য নয়।’ এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয় ওয়াজিব এবং সুন্নতে কিফায়া ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা আবশ্যক।

ইতিকাফের শর্তগুলো : ইতিকাফের শর্ত তিনটি। এক. এমন মসজিদে ইতিকাফ করা যেখানে নামাজের জামাত হয়। দুই. ইতিকাফের নিয়ত করা এবং ইতিকাফকারী বুদ্ধিমান ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। তিন. নারীর ক্ষেত্রে হায়েজ-নেফাস শুরু হলে ইতিকাফ ছেড়ে দেওয়া।

ইতিকাফ ভঙ্গের কারণ : ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে। বীর্যপাত হোক বা না হোক। ইচ্ছাকৃত সহবাস করুক কিংবা ভুলবশত করুক। চুম্বন-আলিঙ্গন ইত্যাদির কারণে বীর্যপাত হলেও ইতিকাফ ভেঙে যাবে। তবে চুম্বন-আলিঙ্গনের কারণে বীর্যপাত না হলে ইতিকাফ ভঙ্গ হবে না। ইতিকাফের স্থান থেকে শরিয়তসম্মত প্রয়োজন কিংবা স্বাভাবিক প্রয়োজন ছাড়া বের হলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে। শরিয়তসম্মত প্রয়োজন হলে মসজিদের বাইরে যেতে পারবে। যেমনÑযে মসজিদে ইতিকাফে বসেছে সেই মসজিদে জুমার নামাজের ব্যবস্থা না থাকলে জুমার নামাজের জন্য অন্য মসজিদে যাওয়া যাবে। স্বাভাবিক প্রয়োজনে মসজিদের বাইরে যেতে পারবে। যেমন পেশাব-পায়খানার জন্য বের হওয়া। খানা পৌঁছে দেওয়ার মতো মানুষ না থাকলে খাবার আনার জন্য মসজিদের বাইরে যেতে পারবে। তবে কাজ সমাপ্ত হলে যথাসম্ভব দ্রুত মসজিদে ফিরবে। যেসব কারণে ইতিকাফ ভেঙে যায় এবং কাজা আদায় করা ওয়াজিব হয় সেসব কারণে নফল ইতিকাফও ভেঙে যায়। তবে নফল ইতিকাফের ক্ষেত্রে যেহেতু কোনো সময়সীমা নির্ধারণ নেই তাই তার কাজাও আদায় করতে হবে না।

ইতিকাফ অবস্থায় মাকরুহ কাজ : ইতিকাফ অবস্থায় চুপ থাকলে সওয়াব হয় এই মনে করে চুপ থাকা মাকরুহে তাহরিমি। বিনা প্রয়োজনে পার্থিব কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া যেমন কেনাবেচা করা মাকরুহ। তবে একান্ত প্রয়োজনে মসজিদে মালামাল উপস্থিত করা ব্যতীত কেনাবেচার চুক্তি করা যাবে। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ইতিকাফে বসা এবং বসানো উভয়টি নাজায়েজ এবং গুনাহের কাজ। (বেহেশতি জেওর : ২৭২)

ইতিকাফ অবস্থায় করণীয় : ইতিকাফ অবস্থায় ভালো এবং নেক কথা বলা। অতিরিক্ত কথাবার্তা না বলা। বেকার বসে না থেকে নফল নামাজ পড়া কুরআন তেলাওয়াত করা। তসবি-তাহলিলে মশগুল থাকা। ইতিকাফ অবস্থায় বিশেষ কোনো ইবাদত নেই। তাই যেকোনো ইবাদত মন চাইলে করা যাবে।

ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান : ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম মসজিদ হলো মসজিদে হারাম। তারপর মসজিদে নববী। তারপর মসজিদে আকসা। তারপর যে জামে মসজিদে জামাতের ব্যবস্থা রয়েছে। তারপর মহল্লার মসজিদ। তারপর যে মসজিদে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মহিলাদের জন্য ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান হলো ঘরের নামাজের জায়গা। (বেহেশতি জেওর : ২৭০) আল্লাহ তায়ালা এই রমজানেই আমাদের সুন্নত ইতিকাফ করার তওফিক দান করুন। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত