শেরপুরে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করলেন পিবিআই
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১১ বিকাল

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় সংঘটিত ডলি আক্তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ বু্্যরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই।
গত ১ এপ্রিল সকালে শ্রীবরদী থানা পুলিশ কর্তৃক সংবাদপ্রাপ্ত হয়ে পিবিআই, জামালপুর জেলার একটি চৌকস টিম ঘটনাস্থল শ্রীবরদী পৌরসভার তাঁতিহাটি পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী পাকা রাস্তার আজ থেকে একটি ট্রাংকে তালাবদ্ধ অবস্থায় তোশকে মোড়ানো হাত-পা বাঁধা একজন অজ্ঞাতনামা মহিলার অর্ধগলিত লাশের পরিচয় তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত করে।
পরিচয় শনাক্তে ভিকটিম নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার মোঃ আলাল মিয়ার কন্যা পরিচয় মোছাঃ ডলি আক্তার।
এরই প্রেক্ষিতে ভিকটিমের পরিবারকে সংবাদ দিলে ভিকটিমের ভাই মোঃ শফিকুল ইসলাম শফিক মিয়া শ্রীবরদী থানায় উপস্থিত হয়ে ডিসিস্টকে শনাক্ত করে এবং নিজে বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলাটি পিবিআই, হেডকোয়ার্টার্স এর মাধ্যমে পিবিআই, জামালপুর গ্রহণ করে মামলার তদন্তভার এসআই (নিঃ) মোঃ আব্দুস সালাম এর উপর অর্পণ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় ৩ এপ্রিল শুক্রবার লাশ বহনকারী অজ্ঞাতনামা নীল রং এর পিকআপ গাড়িটি তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত করে শেরপুর জেলার শ্রীবরদী থানাধীন ভেলুয়া ইউনিয়ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে উদ্ধার ও জব্দ করা হয় (ঢাকা মেট্রো ন ১২ ২৮০৮)। সেইসঙ্গে পিকআপ ড্রাইভার মোঃ আশরাফ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়া হয়। তার দেওয়া তথ্য যাচাই বাছাই করে মামলার ঘটনায় জড়িত ২ জন আসামীকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর জেলায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সর্বশেষ তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় মামলার আসামী মেঃ নিয়ামুর নাহিদ (২৬) ও সহযোগী আসামী তার স্ত্রী মোছাঃ রিক্তা মনিকে (২৬) পুলিশ সুপার, পিবিআই, জামালপুর এর নেতৃত্বে একটি আভিযানিক টিম শেরপুর-ময়নসিংহ মহাসড়কের শেরপুর সদর থানাধীন ভাতশালা পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের সম্মুখে ৪ এপ্রিল শনিবার ভোররাতে চেকপোস্ট বসিয়ে যাত্রীবাহী বাস হতে তল্লাশী করে গ্রেফতার করা হয়। এরপর শেরপুরের বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হলে আসামীদ্বয় স্বেচ্ছায় ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মোতাবেক দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
অত্র মামলার এজাহার পর্যালোচনা, তদন্ত ও আসামীদের ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ যারায় প্রদত্ত জবানবন্দি পর্যালোচনায় জানা যায় যে, ডিসিস্ট ডলি আক্তার (৩৫) এর অনুমান ১৫/১৬ বছর পূর্বে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানাধীন রামপুর সাকিনে জনৈক কাজিম উদ্দিন এর সাথে বিবাহ হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের আকলিমা (১৩) নামে একজন কন্যা সন্তা রয়েছে। উক্ত সন্তান হওয়ার অনুমান ২ বছর পর কাজিম উদ্দিন মারা যায়। পরবর্তীতে অনুমান ৩ বছর পূর্বে ডিসিস্ট ডলি আক্তারের সাথে মোঃ বিল্লাল হোসেন (৪০) এর বিবাহ হয়। বিবাহের পর থেকেই ডিসিস্ট ভালুকা থানাধীন স্কয়ার মাস্টারবাড়ী আইডিয়াল মোড় পয়েন্ট এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে PA Nit সুয়েটার কোম্পানীতে চাকুরী করতো। সেখানে ডিসিস্টের ২ ভাইও চাকুরী করতো। তারা পাশাপাশি এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসাবে বসবাস করতো।
গত ৩০ এপ্রিল ডলি আক্তারের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়ায় বাদী তাঁর ভাইদের সাথে যোগাযোগ করে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুজি করতে থাকে। পরবর্তীতে গত ১ এপ্রিল বুধবার বিকালে শেরপুর জেলার শ্রীবরদী থানা হতে বাদীর মোবাইলে কল করে জানায় যে, কে বা কারা বাদীর বোন ডলি আক্তারকে খুন করে তার লাশ একটি প্লেইনশীটের তৈরী বড় ট্রাংকের ভিতরে ভরে তালাবন্ধ করে ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে গেছে।
তদন্তকালে জানা যায় যে, গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ নিয়ামুর নাহিদ ও রিক্তা মনি গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে ভাড়া বাসায় থেকে টেক্সটাইলে চাকুরী করে। গত ৩০ মার্চ রাত অনুমান ৮ টায় অত্র মামলার গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ নিয়ামুর নাহিদ ডিসিস্ট মোছাঃ ডলি আক্তার এর সাথে তাৎক্ষণিক পরিচয়ের সূত্র ধরে তার স্ত্রী বাসায় না থাকার সুযোগে অনৈতিক কাজের জন্য ডিসিস্টকে আসামীর ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। বাসায় যাওয়ার পর সেখানে তাদের মধ্যে টাকা পয়সা নিয়ে বাকবিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে ডিসিস্ট বেশি চিৎকার চেঁচামিচি শুরু করলে লোক জানাজানির ভয়ে আসামী নাহিদ ডিসিস্টের গলায় গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে রাখে, একপর্যায়ে ডিসিস্ট শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
পরবর্তীতে আসামী তার স্ত্রী রিক্তা মনিকে তার অফিস হতে রাত অনুমান ১০.৩০ ঘটিকায় বাসায় নিয়ে আসার পথে হত্যাকান্ডের বিষয়টি জানায়। পরবর্তীতে তারা উভয়ে মিলে হত্যাকান্ডের বিষয়টি গোপন করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসামী নাহিদ একটি বড় প্লেইনশীটের ট্রাংক কিনে নিয়ে এসে ডিসিস্টের হাত-পা বেঁধে তোশক দিয়ে পেঁচিয়ে উক্ত ট্রাংকে রেখে দেয়।
এরপর গত ১ এপ্রিল আসামী নাহিদ অত্র মামলার ঘটনায় জব্দকৃত পিকআপ ভাড়া নিয়ে মামলার ঘটনাস্থলে ট্রাংকটি রেখে পুনরায় গাজীপুর চলে যায়।
এই বিষয়ে পিবিআই, জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত জানান যে, 'এই ঘটনার সংবাদ প্রাপ্তির পরপরই আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে টিম প্রেরণ করি এবং মামলার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা অব্যাহত রাখি। এরই ধারাবাহিকতায় অত্র ইউনিটের চৌকস সদস্যদের কয়েকটি টিমে ভাগ করে তাদের আলাদা আলাদা দায়িত্ব প্রদান করার পাশাপাশি সার্বক্ষণিকভাবে তাদের কার্যক্রম তদারকি করি এবং সর্বশেষে আমি নিজেই অভিযান টিমে নেতৃত্ব প্রদান করি। সর্বপরি অত্র ইউনিটের অভিযান টিমগুলোর কঠোর পরিশ্রমের অংশ হিসেবে অত্র মামলার মূল রহস্য এত দ্রুত সময়ে উদঘাটন করা সম্ভব হয়।'
গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ নিয়ামুর নাহিদ (২৬) এবং রিক্তা মনিদের (২৬) আদালতে প্রেরণ করা হলে গ্রেফতারকৃত আসামীরা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। আদালত জবানবন্দি গ্রহণশেষে আসামীদের জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করেন। মামলাটির তদন্ত চলমান আছে।







