বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২
শিরোনাম

চার জেলার স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে শেরপুরের একমাত্র জেলা সদর হাসপাতাল


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৪:০১ দুপুর

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, চার জেলার মানুষের স্বাস্থ্য সেবা দিচ্ছে শেরপুরের একমাত্র জেলা সদর হাসপাতাল। তার উপর নামে মাত্র ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল হলেও লোকবল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রয়েছে মাত্র ১০০ শয্যার। যার ফলে এই হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা একেবারে ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কও হাসপাতালে নানা সংকট নিয়ে নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

জানা গেছে, শেরপুর জেলায় পাঁচ উপজেলার প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের বসবাস। এই ১৫ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য একমাত্র ভরসা ২৫০ শয্যার শেরপুর জেলা সদর হাসপাতাল।‌ কিন্তু ভৌগলিক কারণে ব্রহ্মপুত্র নদীর পূর্বপাশে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী ও রাজিবপুর, জামালপুর জেলার, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট ও ফুলপুর উপজেলার আংশিকসহ আরো প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ জরুরি অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবার জন্য শেরপুর হাসপাতালে ভর্তি হয়। কারণ, উল্লেখিত জেলার উপজেলাগুলো থেকে স্ব স্ব জেলা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দূরত্ব শেরপুর সদরের চেয়ে অনেক দূরে। যার ফলে প্রাথমিকভাবে ওইসব এলাকার মানুষ স্বাস্থ্য সেবার জন্য জরুরী ভিত্তিতে সবার আগে শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে আসেন এবং এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ এবং ঢাকায় চলে যায়। পার্শ্ববর্তী জামালপুর জেলায় কয়েক বছর আগে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হলেও ভৌগলিক কারণে উল্লেখিত এলাকার মানুষ প্রথমে শেরপুর জেলা শহরেই স্বাস্থ্য সেবা নিতে আসে।

হাসপাতালের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ ৮২ চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৯ জন। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট ১০টির মধ্যে ১০ টিই শূন্য, জুনিয়র কনসালটেন্ট ১৩টির মধ্যে ৮টি, অ্যানেসথেটিস্ট ৩টির মধ্যে ১টি, রেজিস্ট্রার ১০টির মধ্যে ৫টি পদ শূন্য। নার্সের ১০১টি পদের মধ্যে ৭টি শূন্য রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য স্টাফ, ওয়ার্ডবয়, আয়া, ফার্মাসিস্ট, নাইটগার্ড, ঝাড়ুদার এর লোকবল সংকট তো রয়েছেই।

৩ মার্চ মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের পাঁচ তলায় শিশু ওয়ার্ডের সামনে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জের মেরুর চর এলাকা থেকে হাসান মিয়া তার শিশু কন্যাকে নিয়ে এসেছে চিকিৎসার জন্য। তিনি জানায়, জামালপুর মেডিকেলে যেতে সময় বেশি লাগার কারণে তিনি তার কন্যাকে নিয়ে শেরপুর হাসপাতালে এসেছেন। কিন্তু এখানে চিকিৎসা সেবা বলতে কিছু নেই ফ্লোরেই পড়ে আছে কাল রাত থেকে।

 

এদিকে শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের আইসিইউ এবং সিসিইউ ইউনিটের যন্ত্রপাতি। সেবা গ্রহীতারা বলছেন, জনবলের অভাবে চালু হচ্ছে না ওই বিভাগগুলো। ফলে স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অন্তত ২৫ লাখ মানুষ। প্রায় ৪ বছর আগে ২০ বেডের এই আইসিইউ ইউনিট প্রকল্পটি চালু করতে প্রায় ১৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। অথচ লোকবল না থাকার কারণে সেটিও নষ্ট হওয়ার পথে।

সেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্তসৈনিক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মো. আল-আমিন রাজু বলেন, ‘জেলার মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল হওয়ার কথা ছিল এ হাসপাতালটি। কিন্তু সেটি না হয়ে ভোগান্তির আরেক নাম যেন শেরপুর জেলা সদর হাসপাতাল। দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালের সেবার মান উন্নত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানাই।’

শেরপুর জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেলিম মিয়া জানায়, আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি হাসপাতালের পরিষেবা মানোন্নয়নের জন্য। তবে ডাক্তার, নার্স, স্টাফসহ জনবল সংকট, পর্যাপ্ত ওষুধ ও প্যাথোলজির সরঞ্জাম, পরিষ্কারকর্মীর অভাব এবং দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়া অবকাঠামোর কারণে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এই হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি সহ প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ রুগীর সেবা দেওয়া হয়। এসব রোগীর মধ্যে জেলার বাইরে থেকে প্রায় অর্ধেক রোগী আসে।

তার মধ্যেও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী দিনে রোগীরা যেন আরও ভালো সেবা পান, সে জন্য আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। রোগীদের ভোগান্তি কমাতে সাধারণ জনগণের সহযোগিতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে জেলার সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, শেরপুর ৫ উপজেলা নিয়ে গঠিত হলেও ভৌগলিক কারণে আরো ৬ উপজেলার মানুষ এখানে স্বাস্থ্য সেবা নিচ্ছে। তাই শেরপুরে একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অতি জরুরী হয়ে পড়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত